অ মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং?/ খ্যাঁদা নাকে নাচ্ছে ন্যাদা-নাক ডেঙাডেং ড্যাং!’ এমন মজার ছড়া তোমাদের জন্য কে লিখেছেন বলো? কবি কাজী নজরুল ইসলাম। গতকাল ছিল তাঁর মৃত্যুদিন। প্রিয় এই কবির ছেলেবেলার রোমাঞ্চকর গল্পগুলো কখনো পুরোনো হয় না।
আজ আমরা একজন মানুষের গল্প শুনব। তাঁর শৈশব-কৈশোর আমাদের মতো আনন্দে-আহ্লাদে, ভালোবাসায়-আদরে কাটেনি। তিনি বড় হয়েছিলেন দুঃখে-কষ্টে-অনাদরে। কিন্তু তিনি হেরে যাননি, জয়ী হয়েছিলেন।
দেখি চিনতে পারো কি না তাঁকে। তিনি বাংলা ভাষার খুব বড় কবি ছিলেন। বাল্যকালে তাঁকে ‘তারা খ্যাপা’, ‘নজর আলী’, ‘দুখু মিয়া’ নামে ডাকা হতো। বড়দের জন্য যেমন সাহিত্য রচনা করেছেন, তেমনি আমাদের শৈশব-কৈশোরের বই পড়ার আনন্দকে তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন বহুগুণ। আর কেউ নন, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
আমাদের সঙ্গে মিলিয়ে নিই তাঁকে
শৈশব তাঁর বোধকরি মোটামুটি ভালোই কাটছিল। কিন্তু ১৯০৮ সালে মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। শুরু হয় দুঃখের জীবন। দারুণ অর্থকষ্টে পড়ে যায় নজরুল ও তাঁর পরিবার। দশ বছর বয়সে প্রাথমিক পেরিয়ে তিনি চুরুলিয়া গ্রামের মক্তব, মসজিদ দেখাশোনার কাজ করে অর্থ উপার্জন শুরু করেন। এগারো বছর বয়সে যোগ দেন লেটোগান ও যাত্রার দলে। অবাক কাণ্ড! বারো-তেরো বছর বয়সে তাঁর নাটক রচনা এত ভালো হতে লাগল যে তিনি একসঙ্গে তিনটি লেটোগানের দলে নাটক রচনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এমনকি তিনি তাদের জন্য তাৎক্ষণিক গানও লিখে দিতেন। বড় বড় কবিয়ালের সঙ্গে কবির লড়াইও করতেন মাঝেমধ্যে। একরত্তি ছেলের এত পারদর্শিতা দেখে বড়রা তাঁকে সমীহ করে ‘খুদে ওস্তাদ’ আর ইয়ার্কি করে ‘ব্যাঙাচি’ বলত। কবির লড়াইয়ে গেলে খুদে নজরুল কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না।
এত্ত সব করেও নজরুল কিন্তু লেখাপড়া ছাড়েননি! ১৯১১ সালে ঠিকই তিনি ভর্তি হন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। কিন্তু টাকার অভাবে বেশি দিন পড়তে পারেননি। এরপর রুটির দোকান, মানুষের খাবার পৌঁছে দেওয়া; নানা ধরনের কাজ করেছেন। এক দরদি পুলিশ অফিসার তাঁকে ময়মনসিংহে এনে দরিরামপুর স্কুলে ভর্তি করেন সপ্তম শ্রেণিতে। পরীক্ষায় প্রথম হলেও সেখান থেকে দেশে চলে গিয়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সিয়ারসোল স্কুলে পড়ে ১৯১৭ সালে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
নজরুল মচকেছেন কিন্তু ভেঙে পড়েননি। ঠিকই তিনি একদিন হয়ে উঠলেন ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম।
.তোমাদের জন্য লেখা
নিজের শৈশব-কৈশোর ভালো না কাটলেও তিনি তাঁর ছড়া, কবিতা, গানের মধ্যে আমাদের জন্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন এক আনন্দের জগৎ।
এক রঙের পোশাক পরতে কারই-বা ভালো লাগে বলো! আর প্রতিদিন স্কুলে যেতেই বা কাঁহাতক মন চায়! নিশ্চয়ই আমরা সবাই চাই প্রজাপতির পাখার মতো রঙিন পোশাক। আহা! ঝিলিমিলি রঙের জামা পরে যদি প্রজাপতিদের সঙ্গে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ানো যেত! কতই না মজা হতো! মন চাইলে বিচিত্র রঙের ‘টুলটুলে’ ফুলে বসে মধু খেতে পারতাম! নজরুল কী অসাধারণভাবেই না লিখেছেন—‘মোর মন যেতে চায় না পাঠশালাতে/ প্রজাপতি, তুমি নিয়ে যাও সাথে ক’রে তোমার সাথে/ এই জামা ভাল লাগেনা/ দাও জামা ঐ ছবি আঁকা।’
চুরি করা ভালো নয়। কিন্তু সেটা যদি হয় ফন্দি-ফিকির করে কারও বাগানের পাকা লিচু চুরি করে খাওয়া, তাহলে দুষ্টু ছেলের দলে ভিড়ে লিচু চুরি করতে কার না ইচ্ছে করে! কেউ উঠেছে গাছে, আর কেউ রয়েছে গাছের নিচে। এমন সময় যদি মালিকের কুকুরটা এসে পড়ে, সেই দুর্গতির কি আর শেষ আছে! তখন গাছ থেকে ‘মালির ঘাড়ে’ না পড়ে উপায় থাকে! বেচারা লিচু চোরের জন্য দুঃখও হয়, আবার হাসিও পায়...! নজরুল যখন ‘লিচু-চোর’ ছড়ায় এই বর্ণনা দেন, তখন তা আরও মজাদার হয়ে ওঠে। আমরাও একঘেয়ে পড়া থেকে একটু মুক্তি পেয়ে কল্পনায় ঘুরে আসতে পারি ‘বাবুদের তাল-পুকুর’ থেকে। অথবা ‘খুকী ও কাঠ্বেরালি’ কবিতার খুকীর মতো জমিয়ে কথা বলে আসতে পারি কাঠ্বেরালির সঙ্গে। শুধু তা-ই নয়, দেশমাতাকে এ-ও বলতে পারি যে ‘আমরা যদি না জাগি মা/ কেমনে সকাল হবে?/ তোমার ছেলে উঠলে মাগো/ রাত পোহাবে তবে!’
